গল্পটি ক্লাস ক্যাপ্টেনের

অ্যাসেম্বলিতে সহপাঠীদের ঠিকঠাক দাঁড় করানো, স্কুলের সবাইকে শপথবাক্য পড়ানো, রোল কলের খাতা নিয়ে ক্লাসে ঢোকা… কত্ত কাজ তার! তার পরও ক্লাস ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে সহপাঠীদের অভিযোগের কমতি নেই। লিখেছেন হাবিবুর রহমান তারেকজয়ন্ত সাহা
স্কুলের গেট খুলতে ঢের বাকি! কিন্তু সবার আগে স্কুলে পৌঁছা চাই সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া বালকটির। অ্যাসেম্বলিতে সহপাঠীদের ঠিকঠাক দাঁড় করানো, স্কুলের সবাইকে শপথবাক্য পড়ানো, রোল কলের খাতা নিয়ে ক্লাসে ঢোকা…কত্ত কাজ! ক্লাসের আর সবার চেয়ে পড়াশোনায় একটু ভালো বলে স্যারদের চোখে ‘ভালো ছেলে’র আখ্যাও তত দিনে পাওয়া হয়ে গেছে। বাসা থেকে তেল মালিশ করে ক্লাসটিচারের জন্য মোটা একটা বেত নিয়ে এসেছে সে। সহপাঠীদের মার খাওয়ার দৃশ্যটা দারুণ উপভোগ্য হবে ভেবে তো রাতে ঘুমই হয়নি। কিন্তু হায়! ক্লাসে ঢুকে স্যার তার হাতেই পরখ করে নিলেন বেতের ধার! এ ছেলেটিই শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। ক্লাস ক্যাপ্টেন হিসেবে নিজের কথা বলতে গিয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এই জনপ্রিয় অধ্যাপক।
সময় বদলেছে, কিন্তু বদলেনি ক্লাস ক্যাপ্টেনের কাজ। তবে এই কাজটা অনেকেই খুব ভালোভাবে উপভোগ করলেও অনেকের কাছে এর ভার পর্বতসম!
এত্ত সহজ নয়!
টিফিন পিরিয়ডে ভীষণ হুড়োহুড়ি শুরু করে দিয়েছে আয়েশা, মিতু ও শাম্মী। বৃষ্টিভেজা মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। স্যার-ম্যাডামের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কেউবা মেতে উঠেছে গোল্লাছুটে। কোনোভাবেই থামাতে পারছে না ক্লাস ক্যাপ্টেন এবং একই সঙ্গে বন্ধু নিশি। পুরো ক্লাসের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যে মতিঝিল গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী নিশির কাঁধে!
ক্যাপ্টেন হওয়ার পর জীবনটাই পাল্টে গেছে শহীদ বীর উত্তম লে. কর্নেল আনোয়ার গার্লস স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর নূপুরের। ক্লাসের শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্বের পাশাপাশি পড়াশোনার চাপটাও হঠাৎই বেড়ে গেছে তার। বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান থাকলে পুরো ক্লাসের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে তাকে। এত কিছুর পরও অধিনায়কত্ব কিন্তু বেশ ভালোই উপভোগ করছে সে।
‘আমরা সবাই রাজা’র রাজত্বে হট্টগোল থামাতে গিয়ে ভীষণ বেগ পেতে হয়েছে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাণিজ্য শাখার সোহেলকে। ক্যাপ্টেন হওয়ার পর সব ছেড়ে ডুব দিয়েছেন ইয়া মোটা সব বইয়ের রাজত্বে! পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর না পেলে যে মুখ দেখানোই দায় হবে তার!
ক্লাসে উপস্থিতির হার, হোমওয়ার্কের খাতা নিয়ে ক্লাসটিচারের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে জীবনটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে মেহেদীর! আন্তশ্রেণী ফুটবল টুর্নামেন্টে ক্লাসের নেতৃত্বও দিচ্ছে সে।
ক্লাস ক্যাপ্টেন নিশি তার দায়িত্ব সম্পর্কে জানায়, স্যার না আসা পর্যন্ত ক্লাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নাম ডাকার খাতা এনে দেওয়া, ক্লাসটিচারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা, ল্যাবওয়ার্ক শেষে জিনিসপত্র বুঝিয়ে দেওয়া_আরো কত কী! সহপাঠীদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থাও তাকেই করতে হয়। টিফিন পিরিয়ডে গানের আসর জমিয়ে তুলতে হয় তাকেই। তবে সবচেয়ে কঠিন কাজটি হচ্ছে রেজাল্ট ধরে রাখা। রেজাল্ট খারাপ করলে কেউ যে পাত্তা দেবে না!
ক্লাস ক্যাপ্টেনের কাজটা কঠিন করে তুলতে জুড়ি মেলা ভার শহীদ বীরউত্তম লে. কর্নেল আনোয়ার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সুমি, অনন্যার। ক্লাস শেষ হলেই প্রচণ্ড হৈচৈ জুড়ে দেয় তারা। ক্লাস ক্যাপ্টেন তারিনকে মেনে নিতে বয়েই গেছে তাদের। এর কারণ জানাতে গিয়ে সুমি বলল, ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে!’
মিরপুর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্লাস ক্যাপ্টেন নাসিতা রহমান ক্লাসে বিশৃঙ্খলা এড়াতে অভিনব এক উপায়ও বের করে ফেলেছে। নবম শ্রেণীর এ ছাত্রী শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে মেলে বসে রূপকথার ডালি। আরব্য রজনী, ঠাকুরমার ঝুলি যেন তার মুখস্থ! সহপাঠীরাও বিভোর হয়ে শোনে রূপকথা! কখনো কখনো সুমাইয়া, চৈতিদের নিয়ে চলে ‘অন্ত্যাক্ষরি’ খেলা।
ক্যামব্রিয়ান কলেজের বাংলা মাধ্যমের অষ্টম শ্রেণীর শিবলী জানাল, শিক্ষককে সহযোগিতা ছাড়াও সহপাঠীদের দুর্বলতা স্যারকে জানানো, ‘মেকআপ’ ক্লাসে কারা থাকবে তার তালিকা তৈরি, প্রতিদিনের ফিডব্যাক পরীক্ষার খাতা গুণে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও তাকেই করতে হয়।
হলিক্রস কলেজের অন্তুকে মান-অভিমান ভুলে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয়েছে। তার মতে, ‘বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার, দ্রুত দায়িত্ব বুঝে নেওয়া, পড়াশোনায় মনোযোগ_এ তিনটি গুণ না থাকলে কখনোই একজন ভালো ক্যাপ্টেন হওয়া যায় না।’
গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুলের দশম শ্রেণীর ক্লাস ক্যাপ্টেন খালিদ একরাম লিমনের অভিযোগ–’সবার দাবিদাওয়া নিয়ে আমাকেই স্যারদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। ক্লাসের শৃঙ্খলা রক্ষা করাটা যে কী কঠিন!’
নির্বাচন পদ্ধতি
বন্ধুদের বিপদে-আপদে এগিয়ে আসেন এমন একজন ক্যাপ্টেনকেই হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন আরমান, সজীবরা। আর তাই তো জনপ্রিয়তার দৌড়ে সবাইকে টপকে নেতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন খিলগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের বিল্লাল হোসেন। একজন, দুজন নয়_১১ জন প্রার্থী হয়েছিল মতিঝিল গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাপ্টেন নির্বাচনে। কিন্তু একাদশ শ্রেণীর মেহেদীর কাছে গো-হারা হেরে বসলেন অর্পন, সৈকত, রাব্বীরা। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্যাপ্টেন নির্বাচন করা হয়। শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটেই ক্যাপ্টেন নির্বাচন করা হয়। নবম শ্রেণীর ছাত্রী সুমাইয়া জানাল, ‘নির্বাচনের দিন ক্লাসের পরিবেশটাই বদলে যায়। তবে নির্বাচনী প্রচার না থাকায় উত্তাপটা তেমন পাই না আমরা।’ সহপাঠীদের ভোটে শতাধিক শিক্ষার্থীকে পেছনে ফেলে ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হয়েছে মিরপুর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাসিতা রহমান।
ক্যামব্রিয়ান কলেজের অষ্টম শ্রেণীর শিবলী সহপাঠীদের প্রত্যক্ষ ভোটেই ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হয়েছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ক্যাপ্টেন নির্বাচন একটু অন্য রকমই। স্কুলটিতে বর্ণানুক্রমিকভাবে নির্বাচন করা হয় ক্লাস ক্যাপ্টেন।
মতিঝিল গভর্নমেন্ট গার্লসের ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্বাচন করেন শ্রেণী শিক্ষকরা। তবে দশম শ্রেণীর নীরা তাসনিম জানায়–’পড়াশোনায় ভালো, ক্লাসে মনোযোগী, দায়িত্ব বুঝে নিতে পারে এমন ক্যাপ্টেনই আশা করি। ভোটের ভিত্তিতে ক্যাপ্টেন নির্বাচন করা হলে ভালো হতো।’
অভিযোগ খোদ ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধেই
‘হৈচৈ করলে নাম লিখে রাখে ক্যাপ্টেন সাবিদুল ইসলাম, অথচ সে নিজেও ক্লাসে হৈচৈ কম করে না’_এমনই অভিযোগ খিলক্ষেতের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল মার্ক ইন্টারন্যাশনালের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র রাফিউল ইসলাম রাবি্বর। রামপুরা আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ক্লাস ক্যাপ্টেন অপুর বিরুদ্ধে সহপাঠীদের নামে অকারণেই নালিশ দেওয়া, ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছে সহপাঠী এনামুল, বাদলরা।
যেমন হওয়া উচিত
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লে. কর্নেল মঈনুল ইসলাম চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরির জন্য ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্বাচন করাটা জরুরি। প্রতি ক্লাসেই দুজন ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্বাচন করেন তাঁরা। ভিকারুননিসা নূনের দিবা শাখার প্রধান ফাতেমা নাসরীন বলেন, ‘শেষ সারির ছাত্রীটি যেন হীনম্মন্যতায় না ভোগে, তার মধ্যেও যেন নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে ওঠে সে জন্য বর্ণানুক্রমিকভাবে ক্যাপ্টেন নির্বাচন করা হয়। একই বর্ণে একাধিক নামের ক্ষেত্রে শ্রেণীশিক্ষকরা লটারির মাধ্যমে ক্যাপ্টেন নির্বাচন করেন।’
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের অভিমত, গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচন করার আগে স্কুল কমিটিকে অবশ্যই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি নির্বাচনের অঙ্গীকার করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রভাব খাটিয়ে, শ্রেণীশিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ার জোরে অনেকেই ক্যাপ্টেন হয়ে যাচ্ছে। এটি দূর করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে তোলার জন্য এটিকে একটি ভালো প্রক্রিয়া বলা যাবে।
শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রকাশ্য নির্বাচনের ঘোর বিরোধী। তিনি বলেন, ‘গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন হলে নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্নই থাকে না। একজন ক্যাপ্টেনকে ক্লাসের সবার আস্থা অর্জন করতে হবে, সামাজিক হতে হবে। আজকের ক্লাস ক্যাপ্টেনরাই তো আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে।’
সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ ।। সিলেবাসে নেই ।। তারিখ: ১৩.৭.২০১১
 

শেয়ার :

|

আরো পোস্ট

মন্তব্য করুন