বিদেশি বৃত্তির খুঁটিনাটি

ভিনদেশে উচ্চশিক্ষা কী আর চাট্টিখানি ব্যাপার! কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ, একগাদা কাগজপত্র জোগাড়, ছোটাছুটি করেও এ সুযোগ মিলবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? অথচ একটি স্কলারশিপ জুটিয়ে নিতে পারলে খুব একটা কাঠখড় পোড়াতে তো হবেই না, বিনে খরচায় মিলবে বিদেশি ডিগ্রি। বিস্তারিত জানাচ্ছেন হাবিবুর রহমান তারেক
ভাবছেন─পড়াশোনার খরচটা যদি না থাকত! ভাবনাটাকে সত্যি করা অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়। বছরজুড়েই স্কলারশিপের ঘোষণা দিচ্ছে বিভিন্ন দেশের সরকার, সংস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বৃত্তিতে শুধু পড়াশোনার খরচই নয়, সংশ্লিষ্ট দেশে যাওয়ার বিমান ভাড়াও দিচ্ছে কোনো কোনো দেশের সরকার। স্কলারশিপ প্রোগ্রামের আওতায় টিউশন ফি, শিক্ষা উপকরণ, লাইব্রেরি ফি, বাসস্থান, যাতায়াত, মেডিক্যাল খরচ বহন করছে কর্তৃপক্ষ।
বৃত্তির সুযোগ অনেক দেশে
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলক বেশি বৃত্তির সুযোগ মেলে জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি ও সুইডেনে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জুয়েল পারভেজ দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কোরিয়া ফাউন্ডেশন’ থেকে স্কলারশিপ পেয়ে কেইয়ং হি ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করেছেন। তিনি এখন দেশটিতে ‘ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন’-এ পিএইচডি করার প্রক্রিয়া শুরু করছেন। জুয়েল জানান, তাঁর পরিচিত অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কোরিয়ার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্টের (এনআইআইই) স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করছেন। তিনি পরামর্শ দেন, ই-মেইলে দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সহজেই মিলতে পারে ‘প্রফেসর ফান্ড’ স্কলারশিপ পাওয়ার সুযোগ। এ স্কলারশিপের আওতায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষকদের গবেষণার কাজে সহযোগিতা করেন। কোরিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৫০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী প্রফেসর ফান্ডের মাধ্যমে বৃত্তি পেয়ে দেশটিতে পড়াশোনা করছেন। বাংলাদেশি স্টুডেন্ট ফোরাম, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘গত ছয় বছরে দুই হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এ দেশে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে এসেছেন।’
‘জাপান স্কলারশিপ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ ১০টি দেশে পড়াশোনার সুযোগ মেলে। এই প্রোগ্রামের আওতায় বৃত্তি নিয়ে দ্য ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নে পড়াশোনা করছেন তানজিলা আহমেদ। তিনি জানান, অনলাইনে স্কলারশিপের তথ্য পেয়ে সময়মতো আবেদন করে মিলেছে এ বৃত্তি। তাঁর মতো আরো অনেক বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
এসব দেশ ছাড়াও নিয়মিত বৃত্তি দিচ্ছে নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ব্রুনাই, মরক্কো, কুয়েত, সৌদি আরব, ভারতসহ বেশ কিছু দেশ। ইউনেস্কো, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), কমনওয়েলথ, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি), কোরিয়ান ফাউন্ডেশন, ইউএনডিপি, জার্মানির ‘ডিএএডি’-সহ আরো কিছু সংস্থাও উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষার্থীদের বৃত্তির সুযোগ দিচ্ছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের প্রথম সারির অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ও বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বৃত্তি দিচ্ছে।
যাদের জন্য
একাডেমিক ফলাফল ভালো_এমন শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপের আবেদনের সুযোগ বেশি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্কলারশিপবিষয়ক সাইট থেকে জানা যায়, মাস্টার্স এবং পিএইচডি পর্যায়ে শিক্ষার্থী নির্বাচনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই প্রাধান্য দেয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি নামিদামি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও মূল্যায়ন করা হয়। আবার তুলনামূলক কম পরিচিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পাচ্ছেন ভালো একাডেমিক ফলাফলের কল্যাণে।
ব্যাচেলর, মাস্টার্স, পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট, এমফিল এবং পিএইচডি পর্যায়ে বৃত্তির সুযোগ সবচেয়ে বেশি। মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, বায়োমেডিক্যাল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইকোনমিঙ্, ম্যানেজমেন্ট, সায়েন্স, টেকনোলজি, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টসহ চাহিদাসমপন্ন অনেক বিষয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়ার সুযোগ আছে বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে। মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, চীন, জাপান এবং থাইল্যান্ডে নামিদামি বিষয়ে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি বিষয়ে ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্সে বৃত্তি দিচ্ছে।
আবেদন যেভাবে
সরকারি বৃত্তির ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস কিংবা কনস্যুলেটের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। বৃত্তির আবেদন অনলাইনে অথবা ডাকযোগে পাঠানো যায়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থার বৃত্তির আবেদন করা যায় অনলাইনের পাশাপাশি আঞ্চলিক অফিসের মাধ্যমেও। আবেদনের আগে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ভিজিট করে পুরো প্রক্রিয়া ভালোভাবে জেনে নিন।
অনেকেই কাগজপত্র কার মাধ্যমে সত্যায়িত বা যাচাই করে জমা দিতে হবে, তা নিশ্চিত না হয়েই আবেদন করেন। এর ফলে অনেক যোগ্য শিক্ষার্থীও বৃত্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
যা যা দরকার
বৃত্তির আবেদনের সঙ্গে সাধারণত যুক্ত করতে হয় পাসপোর্ট আকারের ছবি, সব পরীক্ষার সনদ, নম্বরপত্রের কপি (নোটারিকৃত কপি পাঠাতে হয় অনেক দেশের ক্ষেত্রে), সুপারিশপত্র, পারিবারিক আয়ের তথ্য, পাসপোর্ট, মেডিক্যাল সনদ ইত্যাদি। খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আবেদনের ক্ষেত্রে অনেক সময় আইইএলটিএস অথবা টোফেল স্কোরের সনদ প্রযোজ্য না হলেও চলে। তবে ইংরেজিতে ব্যবহারিক দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় যোগ্যতা। আইইএলটিএস প্রযোজ্য হলে স্কোর থাকতে হবে ৬.০ থেকে ৭.০। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আবেদনের যোগ্যতা হিসেবে প্রার্থীর বয়স ৪৫ বা তারও কম হতে হয়।
কখন, কোথায়
দেশ ও প্রোগ্রামভেদে বছরের বিভিন্ন সময় স্কলারশিপের ঘোষণা আসে। পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি পাবেন। বিভিন্ন দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট কিংবা দূতাবাসের ওয়েবসাইটে খোঁজ নিলে ঘরে বসেই মিলতে পারে স্কলারশিপের তথ্য।
‘জাপান স্কলারশিপ প্রোগ্রাম’-এর ঘোষণা আসে সাধারণত জুন-জুলাইয়ে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইটে www.adb.org/jsp) পাওয়া যাবে এ বৃত্তির বিস্তারিত তথ্য। জাপানের ‘এশিয়ান ইয়ুথ ফেলোশিপ’-এর বৃত্তি আবেদনের নোটিশ ও তথ্য পাবেন www.asiaseed.com/ayfj সাইটে। এ ছাড়াও জাপানের ঢাকাস্থ দূতাবাসের ওয়েবেও www.bd.emb-japan.go.jp/en/education/index.html) পাবেন আরো কিছু বৃত্তির তথ্য।
চীন সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ইউনেস্কোর ফেলোশিপ ও স্কলারশিপের তথ্য পাবেন www.csc.ed.cn ওয়েবসাইটে। এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে। চীনের আরো কিছু বৃত্তি প্রোগ্রামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয় এ লিংকে_www.moe.edu.cn/edoas/en। কমনওয়েলথের স্কলারশিপ ও ফেলোশিপের তথ্য পাবেন আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে এ লিংকে_
http://cscuk.dfid.gov.uk/apply।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার বছরে একবার স্কলারশিপের ঘোষণা দেয়। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিচালিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্টের (এনআইআইইডি) ওয়েবসাইটে (www.niied.go.kr) চোখ রাখলেই পাবেন দরকারি তথ্য।
বেলজিয়াম সরকারের ‘স্কলারশিপ প্রোগ্রাম’ শুরু হয় জানুয়ারিতে। সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত আবেদনের সুযোগ থাকে। বিস্তারিত পাবেন এ ওয়েব ঠিকানায়_www.scholarships.vliruos.be।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৃত্তির তথ্য পেতে ভিজিট করুন ‘এডুকেশন ইউএসএ’-এর সাইটে_www.educationusa.info/financial-aid।
এ ছাড়া আমেরিকান সেন্টারেও জানা যাবে বৃত্তির খবরাখবর। সাধারণত বছরের মাঝামাঝি থেকে শেষ দিকে বৃত্তির ঘোষণা দেয় দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাজ্যের বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি ব্রিটিশ কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে (www.britishcouncil.org/bangladesh-education-scholarships-commonwealth.htm) নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।
মালয়েশিয়া সরকারের ‘মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল স্কলারশিপ’-এর বৃত্তির বিজ্ঞপ্তি ও আবেদন প্রক্রিয়ার তথ্য পাবেন মে-জুনে এ সাইটে_www.mohe.gov.my/MIS।
ভারতের ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স’-সহ সব সরকারি বৃত্তির তথ্যও মিলবে অনলাইনে (www.hcidhaka.org/educationOpp.php)। http://digm.meb.gov.tr-এ ওয়েবে তুরস্কের বৃত্তি তথ্য পাবেন মার্চ-এপ্রিলে। বৃত্তির তথ্য পাবেন বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও (www.moedu.gov.bd)।
সূত্র: কালের কন্ঠ ।। সিলেবাসে নেই ।। তারিখ: ১০ আগষ্ট, ২০১০

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.