বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: স্থায়ী ক্যাম্পাস, নইলে ভর্তি বন্ধ

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে ব্যর্থ হবে, তারা নতুন আর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রোববার ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
গত ১৮ জুলাই ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন – ২০১০’ সংসদে পাশ হয়। এরপর ১৮ অগাস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার ব্যাপারে মতামত দিতে বলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাসোসিয়েশন গত ২২ নভেম্বর স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য আরো ১৫ বছর সময় এবং স্থায়ী অবকাঠামোর জন্য সরকারের কাছ থেকে জমি বরাদ্দের দাবি জানায়।
নাহিদ এ সম্পর্কে বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ এর আওতায় প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচ বছরের মধ্যে পাঁচ একর জমিতে নিজস্ব অবকাঠামো নির্মাণ করে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার শর্তেই সাময়িক অনুমতি পেয়েছিল। কিন্তু এখন তারা ওই আইনের আওতায় নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে আরো ১৫ বছর সময় চাইছে, যা অযৌক্তিক, অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য।” সরকার জমি বরাদ্দ না দিলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারবে না- অ্যাসোসিয়েশনের এই দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, “এটি কোনো শর্ত হতে পারেনা এবং তা বাস্তবসম্মত ও আইনসম্মতও নয়।”
মন্ত্রী আরো বলেন, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের আগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের চলমান কোর্স শেষ করতে হবে। এক্ষেত্রে এসব বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বর্তমান সময় থেকে অতিরিক্ত আরো পাঁচ বছর সময় পাবে বলে তিনি জানান। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, “স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার শর্তে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আইনানুযায়ী মাত্র আটটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পেরেছে।”
তিনি বলেন, এ শর্ত পূরণ করতে না পারা ৪৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ সময়ের মধ্যে আরো ১০-১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় এ শর্ত পূরণ করতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। অধ্যাপক নজরুল আরো বলেন, ১৯৯২ সালের আইন অনুযায়ী যারা এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার শর্ত পূরণ করতে পারেনি, তাদেরকে এ সময়ের মধ্যেই ওই শর্ত পূরণ করতে হবে।
“এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর আওতায় জানুয়ারির মধ্যে আরো কিছু নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমতি দেওয়া হবে, যারা নিজস্ব ক্যাম্পাসসহ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারবে,” বলেন তিনি। ২০১০ সালের আইন অনুযায়ী নতুন যেসব বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাবে, তাদের সাত বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হবে। এ পর্যন্ত ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন জমা পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
ইউজিসি’র চেয়ারম্যান আরো জানান, এর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে ইতোমধ্যেই খোঁজ-খবর নেওয়া হয়েছে, যারা সাময়িক অনুমতি পেতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রী আরো বলেন, “সরকার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য করছে না। কিন্তু আমরা চাই শিক্ষার্থীরা যেন সুষ্ঠু শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে। তাই এসব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এসব শর্ত পূরণ করতেই হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় ব্যস্ত সড়কের পাশে বিপণীবিতান, হোটেল-রেস্তোরা এবং সিএনজি স্টেশনের পাশে স্বল্প পরিসরে ভাড়া বাড়িতে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। শিক্ষার মান নিশ্চিতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্যই শর্ত পূরণ করতে হবে। স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে বলে শিক্ষা সচিব কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী জানান।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি তাদের কোনো বর্ধিত, অতিরিক্ত ক্যাম্পাস এবং ইনস্টিটিউট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে না। এছাড়াও নতুন কোনো অনুষদ, বিভাগ এবং প্রোগ্রাম চালুরও অনুমোদন দেওয়া হবে না। তাদেরকে বর্তমান সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কার্যক্রম চালাতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাজধানীতে বহু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় ঢাকার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দেশে বর্তমানে ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িক অনুমতি নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর মধ্যে দু’টি ছাড়া ৪৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে ৫ বছরের মধ্যে যাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় দু’টি হলো- আশা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়।
অনুমতি বাতিল হওয়া তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে একনো কার্যক্রম চালাচ্ছে। এগুলো হলো আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, কুইন্স ইউনিভার্সিটি ও সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি।স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার শর্ত পূরণ করে প্রথম ক্যাটাগরিতে রয়েছে আটটি বিশ্ববিদ্যালয়।এগুলো হলো- নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি, চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলোজি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলোজি।
দ্বিতীয় ক্যাটাগরি অর্থাৎ যারা স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জমি কিনেছে এবং অবকাঠামো নির্মাণাধীন এমন বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচটি। এগুলো হলো ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটি ও সিটি ইউনিভার্সিটি।তৃতীয় ক্যাটাগরিতে রয়েছে যারা জমি কিনেছে কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেনি। এমন বিশ্ববিদ্যালয় ন’টি।
এগুলো হলো আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, দি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলোজি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
চতুর্থ ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন থাকলেও আইনানুযায়ী তা নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে নয়। এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ন’টি। এগুলো হলো দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট, নর্দান ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
যেসব বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি তারা পঞ্চম ক্যাটাগরিতে রয়েছে। এরকম বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সাতটি।এগুলো হলো দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি।
এসব বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯২ এর আইন (সংশোধিত ১৯৯৮) অনুযায়ী পাঁচ বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার শর্ত নিয়ে সাময়িক অনুমতি পেয়েছিলো। ইতোমধ্যেই এগুলো কোনো কোনোটি সর্বোচ্চ ১৭ বছর এবং সর্বনিম্ন সাত বছর অতিক্রম করলেও প্রতিষ্ঠাকালীন স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। উপরন্তু গত ২২ নভেম্বর আরো ১৫ বছর সময় চায়।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত যুগ্ম সচিব এস এম গোলাম ফারুক প্রমুখ।
সূত্র: বিডিনিউজ ২৪

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

gtag('config', 'UA-69122190-1');