মতামত : ইউজিসির নতুন নীতি, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্যাম্পাস খোলার সুযোগ

বাংলাদেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস পরিচালনার সুযোগ ও শিক্ষার্থী বিনিময় সংক্রান্ত নীতি ‘ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন’-এর খসড়া তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এ নীতি অনুমোদন পেলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের অনুমোদিত কোর্স এখানকার স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসের মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা থাকবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে চুক্তিবদ্ধ এজেন্টের মতোই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স ও কারিকুলামের অধীনে যেমন তালিকাভুক্ত কলেজে স্নাতকে পড়াশোনা করা যায়, ঠিক তেমনই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এ দেশে বিভিন্ন কোর্সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে এ দেশের শিক্ষার্থীরা। এর ভালো দিক অবশ্যই আছে, আবার ঝুঁকিও আছে। কারণ, শিক্ষার্থীদের সাথে স্থানীয় ক্যাম্পাস বা ‘স্টাডি সেন্টার’ পরিচালনাকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের আশঙ্ক্ষা আছে। দুটি দেশে দুই প্রতিষ্ঠান থাকায় শিক্ষার্থীরা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের অনিয়মকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাবে না। ইউজিসির ‘ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন’ নীতির পুরনো ও খসড়ায় অনেক কিছুই অস্পষ্ট। বেশ কয়েক বছর ধরেই এ নীতির দুর্বলতার সুযোগে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, গ্রিনিচ, অক্সফোর্ড বুকার্স, লন্ডন মেট্রোপলিটনসহ আরো কিছু কলেজ-ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে আইন, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এসিসিএ, সিএটিসহ আরও কিছু বিষয়ে কোর্স পরিচালনার জন্য ঢাকা-সিলেট-চট্রগ্রামের কিছু প্রতিষ্ঠানকে ‘স্টাডি সেন্টার’ হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। এরা টিউশন ফি নিচ্ছে ব্রিটিশ মূদ্রায় (পাউন্ডে), তবে নির্ধারিত ফি থেকে অনেক বেশি। এসব কোর্সের পরীক্ষার সমন্বয় করে ব্রিটিশ কাউন্সিল। এভাবে কোর্স পরিচালনায় আইনি বৈধতার প্রশ্ন থাকলেও এত বছর ধরে ইউজিসির গ্রিন সিগনালে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ‘ব্যবসা’ (কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা শিক্ষা কার্যক্রম নয় ) টিকিয়ে রেখেছে। আইনি ঝামেলা এড়াতে এসব প্রতিষ্ঠান ‘ডিসটেন্স লানিং’ বা দূরশিক্ষণ নীতির সুযোগও নিচ্ছে।
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে দু-দেশের দুটি প্রতিষ্ঠানের (বাংলাদেশের বিজিএমইএ ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজির সাথে ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানের) শিক্ষার্থী বিনিময়ের একটি প্রটোকল সাক্ষর হয়। কিন্তু ‘ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন’-এর বর্তমান নীতি এ প্রটোকলবান্ধব নয়, সম্ভবত এ কারণেই বিদেশি শিক্ষার্থী বিনিময় প্রক্রিয়ার আইনি ধাপটি সহজ করতেই দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকা এ নীতিকে হঠাৎ কাটছাঁট করে বাস্তবায়ন করতে এত্ত তাড়াহুড়া!
অবশ্য এ নীতি বাস্তবায়নে অনেক জটিলতারও অবসান হবে। শিক্ষার্থীরা দুই বছর বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করে তৃতীয় বছর জটিলতা ছাড়াই কাঙ্খিত বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে গিয়ে বাকি সেমিস্টার বা কোর্স শেষ করতে পারবেন। এর ফলে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার প্রক্রিয়াগুলো ঝুঁকিমুক্ত, নিরাপদ ও সহজ হবে । তবে বিদেশি সনদের সমতা নিয়েও ইউজিসির অদ্ভুত নীতি আছে। বিদেশে পড়াশোনা শেষে সনদ নিয়ে দেশে ফেরা শিক্ষার্থী ও এ দেশে বসে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের বেলায় ‘সনদের সমতা’ নীতি একই। বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে ইউজিসিতে সনদের সমতার (এ দেশের প্রচলিত ডিগ্রির সাথে বিদেশি ডিগ্রির সমতা করার আইনি নির্দেশ আছে ইউজিসির নীতিতে) আবেদন করতে গেলে ঘটে আরেক বিপত্তি। অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর মানের ডিগ্রি তিন বছর মেয়াদী হওয়ায় ইউজিসি স্থানীয় ডিগ্রির সাথে মিলিয়ে চার বছরের বদলে তিন বছর মেয়াদী ব্যাচেলর ডিগ্রির সমমান দেয়। তাহলে কী দাঁড়ালো? বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দিয়ে শিক্ষার্থীদের একদিকে উৎসাহ দেওয়া হলো, অন্যদিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া হলো..

–  হাবিবুর রহমান তারেক

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.