আনন্দ স্কুল নিরানন্দ চিত্র

অনেক জায়গায় স্কুল আছে নামে, কার্যক্রম নেই। অনেক স্কুল চলছে ভাড়া করা শিক্ষার্থী দিয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুয়া পরীক্ষার্থী পালানোর ঘটনা তো সবারই জানা। নিয়মনীতি না মেনেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অনেক ভুঁইফোড় এনজিওকে। তদারকি কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। আনন্দ স্কুলের নামে আছে এ রকম অনেক অভিযোগ। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আরাফাত শাহরিয়ার হাবিবুর রহমান তারেক

সাইনবোর্ডে স্কুল, আদতে গোয়ালঘর। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় গোয়ালঘরকেই আনন্দ স্কুল হিসেবে দেখানো হয়েছে! স্কুলটি পরিচালনার দায়িত্বে আছে স্থানীয় এনজিও সার্ভ আওয়ার সোসাইটি। সাটুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মজিদের আরো অভিযোগ, তিনি সরেজমিনে সার্ভ আওয়ার সোসাইটি পরিচালিত আনন্দ স্কুলের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি।

শুধু মানিকগঞ্জ নয়, সারা দেশের চিত্র প্রায় একই। অনেক জায়গায় আনন্দ স্কুলের কার্যক্রম সাইনবোর্ড টানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এসব স্কুলে নেই ছাত্র। অনেক জায়গায় স্থানীয় স্কুলগুলোতে পড়ছে, এমন ছাত্রদের আনন্দ স্কুলের ছাত্র হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ আনন্দ স্কুলের এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ঝরেপড়া শিশুদের জন্য। ছাত্র বা প্রকৃত ছাত্র না থাকলেও প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা ঠিকই ভাগ-বাটোয়ারা করে নিচ্ছে প্রশাসন, শিক্ষা অফিস, এনজিও ও সংশ্লিষ্টরা।
স্কুল কাগজ-কলমেই
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের দয়ার চওড়া গ্রামবাসী জানান, অনেক দিন থেকে আনন্দ স্কুলের কোনো কার্যক্রম নেই। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায়ও আনন্দ স্কুলের কোনো চিহ্নই নেই। অথচ কাগজ-কলমে উপজেলায় ৪২টি আনন্দ স্কুল আছে। ফেনারবাক ইউনিয়নের বিনাজুড়া, রসুলপুর এবং বিষ্ণুপর গ্রামে গিয়ে কোনো স্কুল ও শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যায়নি। অথচ প্রকল্প চালুর পর থেকেই এসব স্কুলে শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষকের বেতন এবং শিক্ষার্থীদের মাসিক বৃত্তির টাকা তোলা হচ্ছে। বিষ্ণুপর গ্রামের আনন্দ স্কুলের শিক্ষক বিনয় সরকারকে ছাত্র নেই কেন জিজ্ঞেস করলে তিনি এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। স্থানীয়রা জানান, তাঁরা কোনো দিন আনন্দ স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখা হতে দেখেননি।
স্থানীয় এনজিও ‘আইডিয়া’র নির্বাহী পরিচালক মো. নজমুল হক অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘অর্থ লেনদেনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং উপজেলা শিক্ষা অফিস করে থাকে।’ জামালগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিয়া অভিযোগের বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘আনন্দ স্কুলের কার্যক্রম সব সময় পরিদর্শন করা সম্ভব হয় না।’
ভাড়া করা শিক্ষার্থী!
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে আনন্দ স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় দেড় লাখ। অথচ এদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় সব বিষয়ে অংশ নিয়েছে ৭৮ হাজার ৭৯৩ জন।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, এবার সমাপনী পরীক্ষার প্রথম দিন এই উপজেলায় ২৩ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সবাই মুচলেকায় স্বীকার করেছে, তারা আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী নয়। টাকা-পয়সার লোভ দেখিয়ে তাদের আনন্দ স্কুলের হয়ে পরীক্ষায় হাজির করা হয়েছিল। এবারের সমাপনী পরীক্ষায় সাটুরিয়া উপজেলা থেকে আনন্দ স্কুলের প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। এদের অধিকাংশ ভুয়া শিক্ষার্থী।
সার্ভ আওয়ার সোসাইটির পরিচালক নাসিমা ইমাম হলেও এটি পরিচালনা করেন তাঁর স্বামী ওয়াদুদ রহমান। তিনি দাবি করেন, অভিযুক্ত ২৩ শিক্ষার্থী ভুয়া নয়। এরা সবাই আনন্দ স্কুলের নিয়মিত শিক্ষার্থী। মানিকগঞ্জের অপর একটি আনন্দ স্কুলের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সংশ্লিষ্ট এনজিওর চাপে তাদের স্কুল থেকে এবার ১০ জন সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এদের চারজন তাদের স্কুলের ছাত্র নয়। অপর দুজন দুই
বছর আগে আনন্দ স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে!
মেহেরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে গ্রেপ্তার আতঙ্কে প্রায় দুই হাজার ভুয়া পরীক্ষার্থী প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ফেলে পালিয়ে যায়। জেলার গাংনী উপজেলার যুগীরঘোপা কেন্দ্রে ১৪৬ জন ভুয়া পরীক্ষার্থী আটক হলেও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামের উপস্থিতিতে তারা মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পায়। বিভিন্ন স্কুলের সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ভাড়া করে তাদের পরীক্ষার্থী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় দিনে ভুয়া পরীক্ষার্থী আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে আনন্দ স্কুলের পরীক্ষার্থীরা পালিয়ে যায়। সততা গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার পরিচালনায় আনন্দ স্কুলের ৬৩ জন ভুয়া শিক্ষার্থীও ছিল। পালিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা আনন্দ স্কুলের বলে জানান উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এহসানুল হাবিব।
টাঙ্গাইলে পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এনজিও পরিচালিত আনন্দ স্কুলের প্রায় তিন হাজার ভুয়া পরীক্ষার্থী গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়েছে। অনেকে আগেই বুঝতে পেরে পরীক্ষার হলে উপস্থিত হয়নি। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে জানা যায়, আনন্দ স্কুলের সাত হাজার ৭৯৩ শিক্ষার্থী এবার সমাপনী পরীক্ষার জন্য নিবন্ধিত হয়। এদের মধ্যে পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল দুই হাজার ৮৯৩ জন। গোপালপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) যতীন্দ্র মোহন মণ্ডল বলেন, গোপালপুরে আনন্দ স্কুলের দুই হাজার ৪৬২ শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হলেও পরীক্ষায় উপস্থিত ছিল এক হাজার ৪২৫ জন।
টাকার ভাগাভাগিতে ব্যস্ত সবাই
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকাশিত ‘প্রকল্প পরিচালন সহায়িকা’য় এ প্রকল্পে মোট ব্যয় ৩৮৩.০১৯ কোটি টাকা (২০০৯ সালের জুন পর্যন্ত) উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ভাতা ও পোশাক ভাতা বাবদ বছরে মোট ৬০০ টাকা এবং চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বছরে মোট ৯৭০ টাকা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের শিবরাম গ্রামের দয়ার চওড়া আনন্দ স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, এ স্কুলে প্রকৃত কোনো শিক্ষার্থীই নেই। স্কুলের শিক্ষক লিলি বেগম স্বীকার করেন, এ স্কুলের শিক্ষার্থীদের কয়েকজন বিভিন্ন স্কুলে পড়েন। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে আনন্দ স্কুলের চিত্র অনেকটা এমনই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আনন্দ স্কুলের কার্যক্রম তদারকি করে না কেউ। ভুয়া শিক্ষার্থীর নামে বরাদ্দের টাকা ভাগাভাগিতেই ব্যস্ত সংশ্লিষ্ট সবাই।
কুড়িগ্রামের হলোখানা মহিলা উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আবুল হোসেন জানান, স্কুলের অনুমোদন নিতে স্কুলপ্রতি উপজেলা শিক্ষা অফিস ও উপজেলা শিক্ষা কমিটিকে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসার নিখিল চন্দ্র রায় অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে জানান, স্কুল অনুমোদনের সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না।
ইএসপির দায়িত্বে ভুঁইফোড় এনজিও
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ‘শিক্ষাসেবা প্রদায়ক সংস্থা’ বা ইএসপি নির্বাচনের যে নিয়ম আছে, তা মানা হয়নি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। ‘আনন্দ স্কুল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ অনুযায়ী পাঁচ বছরের জন্য সরকারের তালিকাভুক্ত এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় তিন বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন এনজিওকে দায়িত্ব দেওয়ার নিয়ম থাকলে তা মানা হচ্ছে না। নিয়মনীতি না মেনে উৎকোচের বিনিময়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অনেক ভুঁইফোড় এনজিওকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর সঙ্গে জড়িত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।
মেহেরপুরে গাংনী উপজেলায় পাঁচটি এনজিও ১৫২টি আনন্দ স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এগুলো হলো গাংনীর সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা আবদুল গনির ভাইয়ের কুমারীডাঙ্গা পল্লী উন্নয়ন সংস্থা, সততা গ্রাম উন্নয়ন সমিতি, চৌগাছা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা, গাংনী এইচআরডিপি ও শহীদ সেবা সংস্থা। সরেজমিন গিয়ে তাদের অধিকাংশ শিক্ষাকেন্দ্রের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভুয়া শিক্ষার্থী ভর্তি দেখিয়ে স্কুল পরিচালনার ব্যাপারে সততা গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী আশরাফুজ্জামান লালু বলেন, ‘অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা আনন্দ স্কুল থেকে আর্থিক সুবিধা নেয়, তাই তাদের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হয়েছে!’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা ‘আনন্দ স্কুল’ পরিচালনা করলেও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এ কার্যক্রমের তদারকির দায়িত্ব দিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (এলজিইডি)। সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়, এলজিইডি এ প্রকল্পের কার্যক্রম মনিটরিংয়ের পর প্রতিবছর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। অথচ এ প্রতিবেদনে কোথাও অনিয়ম ও দুর্নীতির উল্লেখ নেই। এলজিইডির তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা মুনির সিদ্দিকী দাবি করেন, তদারকির বিষয়টি রস্ক প্রকল্পের কর্মকর্তাদের, আমাদের কাজ কেবল তথ্য সংগ্রহ করা। রস্ক প্রকল্পের পরিচালক মো. আতাউল হক এ বিষয়ে জানান, তদারকির দায়িত্ব এলজিইডির। বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অনেক এনজিওর আনন্দ স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছি। কোনোটির বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তদন্ত করে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।’
========================
একনজরে আনন্দ স্কুল

প্রচলিত শব্দে ‘স্কুল’ বলতে যা বোঝায়, আনন্দ স্কুল আসলে তেমন কিছু নয়। বাড়ির উঠোন, বারান্দা বা ঘরকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয় এর কার্যক্রম। উপজেলা পর্যায়ের ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘আনন্দ স্কুল’। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ‘রস্ক’ (রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন) প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে আনন্দ স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ সরকার এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক অর্থায়ন করছে এতে। ২০ উপজেলায় ৭২৭টি শিখন কেন্দ্রের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়। ২০০৮ সালে ৬০টি উপজেলায় এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। স্কুলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৭৭৯ এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। এ বছরের আগস্টে আরো নতুন ৩০টি উপজেলায় স্কুল চালু হয়েছে বলে জানালেন রস্ক প্রজেক্টের কনসালট্যান্ট আ ন স হাবীবুর রহমান। তিনি জানান, কেন্দ্রীয়ভাবে ২০ জন পরিচালনা করলেও স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিনিধি, উপজেলা শিক্ষা অফিস, শিক্ষাসেবা প্রদায়ক সংস্থা (ইএসপি) হিসেবে এনজিও, শিক্ষার্থীর অভিভাবক এবং স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরাই এ স্কুল কার্যক্রম দেখাশোনা করেন।
সূত্র: কালের কন্ঠ । সিলেবাসে নেই । তারিথ: ২৮ ডিসেম্বর, ২০১০

  • শিক্ষাবিষয়ক দরকারি তথ্য তাৎক্ষণিক পেতে আমাদের ফেইসবুক পেজে লাইক দিয়ে রাখুন : www.facebook.com/EducationBarta
  • মন্তব্য করুন

    This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.