দূর পরবাসে যেমন আছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

বিদেশি ডিগ্রি আর উন্নত জীবনের স্বপ্নে প্রতিবছর ভিনদেশে পাড়ি জমায় হাজার হাজার বাংলাদেশি। খণ্ডকালীন কাজ না পেয়ে শুরুতেই ধাক্কা খায় অনেকে। টিউশন ফি জোগাড় না করতে পেরে পড়াশোনা বন্ধের জোগাড় হয় কারো কারো। আবার ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে অনেকের পড়াশোনাই ওঠে লাটে। এর উল্টো চিত্রও অবশ্য আছে। বিদেশে বাংলাদেশি
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের গল্প শোনাচ্ছেন হাবিবুর রহমান তারেক
‘এসেছি পড়াশোনা করতে। স্বভাবতই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা উচিত। কিন্তু উপায় নেই। থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই পড়াশোনার চিন্তার চেয়ে এ দেশে টিকে থাকার দুশ্চিন্তাই বেশি।’_বললেন লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাসান মেহরাব।
বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নে বিভোর নজরুল ইসলাম জায়গা-জমি বেচে ভর্তি হয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট লন্ডন কলেজে, ছেড়েছিলেন শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা। টিউশন ফি জোগাতে না পেরে পরে ভর্তি হন লন্ডন কলেজ অব ল’তে। এর কয়েক মাস পরই অনিয়মের অভিযোগে কলেজটির অনুমোদন বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। ‘ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। কলেজের অনুমোদন না থাকায় ভিসা নবায়ন করা সম্ভব হবে না। দেশে ফিরলে মা-বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন। এ কারণে সেটাও সম্ভব নয়।’
স্বপ্নের দেশে পড়তে গিয়ে দুঃস্বপ্নে রাত কাটছে এমন আরো অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর। পর্যাপ্ত খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ নেই। অনেকে খণ্ডকালীন কাজ পেলেও আয়ের টাকায় টিউশন ফি তো দূরের কথা, থাকা-খাওয়ার খরচও জোটে না। আবার ভর্তি হওয়ার পর অনেকে জানতে পারেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি মানসম্মত নয়। কখনো কখনো ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধও হয়ে যায়। ফলে পড়াশোনা ছেড়ে নাম লেখাতে হয় শ্রমিকের খাতায়। তাদের অনেকেরই আবার নাম ওঠে অবৈধ অভিবাসীর তালিকায়।
যুক্তরাজ্যে পাউন্ড আদায় করাই মূল কাজ
ঘোরি মোহাম্মদ সাইফুল বারী যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং কলেজে ভর্তি হয়েছেন মাস কয়েক আগে। তিনি বলেন, ‘লন্ডনে যে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম, তা যে পূরণ হবে না_এটা প্রথম দিন কলেজে এসেই বুঝেছি। কলেজটিকে বাংলাদেশের একটি উন্নত মানের কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পাঁচতলা ভবনে ছয়টি কলেজ, এমনকি একই ফ্লোরে একাধিক কলেজও আছে।’
হুমায়ুন রশিদ ও মমিন নামে সিলেটের আরো দুই ছাত্র ভর্তি হয়েছেন একই কলেজে। খরচ জোগাতে না পেরে লাটে উঠতে বসেছে তাঁদের পড়াশোনা প্রায় অনিশ্চিত। হুমায়ুন জানান, কাজ না করে ব্যয়বহুল দেশটিতে খরচ চালানো সম্ভব নয়। অথচ কাজ যেন সোনার হরিণ। তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে মসজিদে রাত কাটাতে দেখেছি। সবাই ভাবে, বিদেশে পড়তে গেলেই দুই হাতে টাকা আয় করা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চাইলেই কাজ পাওয়া যায় না। আর পেলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পারিশ্রমিক অনেক কম।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে লন্ডন থেকে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এখানকার একটি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর বুঝলাম, পাঠদান নয়, সময়মতো পাউন্ড আদায় করাই কলেজের মূল কাজ।’ যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব গ্রিনিচের ব্যাচেলর প্রোগ্রামের ছাত্র রিফাত চৌধুরীর অভিমত, ‘পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেই কেবল পড়াশোনার উদ্দেশ্যে এখানে আসা উচিত।’
আমেরিকায় অবৈধ হয়েও থাকছে অনেকে
সাত বছর আগে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার মনিরুল ইসলাম শামীম। কুইন্স কলেজে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করে তিনি নিউইয়র্কের হেলথকেয়ার ম্যানেজমেন্টের ওপর এখন মাস্টার্স করছেন ডউলিন কলেজে। শামীম জানান, পড়াশোনা করতে আসা অনেক বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত। তবে অনেক শিক্ষার্থী দেশটিতে থাকছে অবৈধভাবেই।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের মোহাম্মদ ইমরান নৌবাহিনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ভর্তি হয়েছেন ডিজাইনিং বিষয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সে। তিনি জানান, মার্কিন সিনেটে ‘ড্রিম অ্যাক্ট’ বিল পাস না হওয়ায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়েছে। এই বিল পাস হলে অনেক অবৈধ অভিবাসী শিক্ষার্থী সে দেশে বৈধতা পেত। তবে অপরাধমূলক কাজ না করলে সাধারণত অবৈধ অভিবাসীদের হয়রানি করা হয় না। তাই পড়াশোনা এবং কাজ করতে তাদের কোনো বাধা নেই।
ইউরোপে থাকা-খাওয়ার খরচটা বেশি
স্কলারশিপ পেয়ে ইউরোপীয় দেশ জার্মানিতে এসেছিলেন নাইমুল ইসলাম। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে পড়ছেন তিনি। নাইমুল জানান, জার্মানিতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা কাজ করতে পারে ছুটির দিনগুলোতে। এখানে শিক্ষার্থীদের জীবন স্বাভাবিকভাবেই চলছে। তবে থাকা-খাওয়ার খরচটা অনেক বেশি। স্কলারশিপ পেয়ে ইউরোপের আরেক দেশ সুইডেনে তথ্যপ্রযুক্তিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন মাসুদ করিম। তিনি জানান, বৃত্তি পাওয়ায় এখানে টিউশন ফি দিতে হচ্ছে না। তবে এখানে থাকা-খাওয়ার খরচ অনেক বেশি। তা ছাড়া খণ্ডকালীন কাজেরও অনুমতি নেই।
কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না জানতে চাওয়া হলে মাসুদ জানান, ভাষাজনিত সমস্যা ছাড়া আর কোনো অসুবিধা নেই। এখানে আসার আগে সুইডিশ ভাষা শিখে এলে ভালো হতো।
মৌলভীবাজারের ছেলে শরিফ আহমেদ পাঁচ বছর আগে ফ্রান্সে পাড়ি জমান। একটি ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা করে এখন পড়ছেন ‘ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কমার্স’ বিষয়ে। শরিফ জানান, অন্যান্য দেশে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে ভিসার মেয়াদ বাড়ানো যায় না। আর এখানে ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও কোনো সমস্যা নেই। এই সুযোগে বাংলাদেশিরা পড়াশোনাটা শিকেয় তুলে শ্রমিকের খাতায় নাম লেখাচ্ছে।
প্যারিসে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশি জয়নাল আবেদিন জানান, তাঁর রেস্টুরেন্টে দুই বাংলাদেশি কাজ করেন, যাঁরা আগে পড়াশোনা করতেন। এখন আর করছেন না। নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়ামে সবাই ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা।
ভালো-মন্দের মিশেলে মালয়েশিয়া
২০০৫ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী। তিনি পড়ছেন সানওয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজে। মালয়েশিয়া থেকে তিনি ফোনে বলেন, ‘ছয় বছর হয়ে গেছে, অথচ এখনো অনার্স কোর্সর্ শেষ হলো না। পড়াশোনার খরচের জন্য পরিবারের যা বাজেট ছিল, তা অনেক আগেই শেষ। জানি না, অনার্স শেষ করতে পারব কি না। যে টাকা দিয়ে এখানে পড়াশোনা করছি, এর চার ভাগের এক ভাগ টাকা দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে এত দিনে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করা যেত।’
অন্যদিকে, মালয়েশিয়ায় দিব্যি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন দেশটির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির জোহর বারু ক্যাম্পাসের ছাত্র সোহেল রানা। তিনি জানান, এখানকার পড়াশোনার মান অনেক ভালো। তবে অনেক কলেজে ছাত্র ভর্তি করানো হয় শুধু বিদেশিদের এ দেশে ঢোকার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। তাই ভর্তির আগে শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি। একই ক্যাম্পাসে আরো ১৪ জন বাংলাদেশি পড়াশোনা করছেন বলেও জানান সোহেল।
সাইপ্রাসে নিজেকে পর্যটক মনে হচ্ছে
এইচএসসি পাস করে রাজধানীর তেজগাঁও কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাইফুল ইসলাম। বছর না যেতেই সিদ্ধান্ত নেন, বিদেশে ‘হোটেল ম্যানেজমেন্ট’ বিষয়ে পড়বেন। পছন্দের দেশগুলোতে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে ভর্তি হন সাইপ্রাসের লেনিয়া কলেজে। তিনি বলেন, ‘ছোট্ট এই দ্বীপ দেশটির যেখানে যাই, সেখানেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চোখে পড়ে। কেউই ভালো নেই। কারণ, দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতি নেই।’
কেইএস কলেজের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘কলেজে পড়াশোনা হয় দায়সারাভাবে। সাধারণত দিনে ক্লাস হয় দুই ঘণ্টা; বাকি সময়টা ঘুরেই বেড়াই। এ দেশে আসার পর ছাত্র নয়, নিজেকে পর্যটক মনে হচ্ছে।’
পড়াশোনা ও কাজ−কানাডায় দুটোই একসঙ্গে
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ভিক্টোরিয়া থেকে পিএইচডি করছেন মতিউর রহমান। তিনি জানান, ভালো ফল করলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়া অনেক বাংলাদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করছে। পড়াশোনা করতে গিয়ে কানাডার টরন্টোতে স্থায়ী আবাস গড়েছেন বাংলাদেশের জয়নাল আবেদিন। তাঁর ছোট ভাই দেশটির মাউন্ট অ্যালিসন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। জয়নাল জানান, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এ দেশে পড়াশোনা ও কাজ_দুটোরই সুযোগ আছে।
জাতিবিদ্বেষের রেশ কাটেনি অস্ট্রেলিয়ায়
ভারতীয় শিক্ষার্থীদের আর অস্ট্রেলীয় শ্বেতাঙ্গদের জাতিগত সংঘর্ষ হয়েছিল ২০০৯ সালে। এর শিকার হয়েছিল বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও। শ্বেতাঙ্গরা ভারতীয় ভেবে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদেরও আক্রমণ করেছিল। এর রেশ কাটেনি এখনো। ডিকিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মুরসালিন জানান, গত এক বছরে অল্প কিছু বাংলাদেশি-ভারতীয় শিক্ষার্থী এ দেশে ভর্তি হয়েছেন। অথচ আগে যত বিদেশি এ দেশে পড়তে আসত, তাদের বেশির ভাগই ছিল ভারতীয় ও বাংলাদেশি।
ভর্তি-ভিসায় আগের চেয়ে অনেক কড়াকড়ি হওয়ায় এবং জাতিবিদ্বেষের কারণে অস্ট্রেলিয়া থেকে অনেক বাংলাদেশি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ছাত্র দিনার মাহমুদ জানান, আগের অবস্থা এখন আর নেই। তবু ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। এ ছাড়া অন্য সবকিছুই স্বাভাবিক। দিনার আরো জানান, খণ্ডকালীন কাজ করলে হাতখরচটা হয়ে যায়।
ভাষা জানা না থাকলে সমস্যা দক্ষিণ কোরিয়ায়
দক্ষিণ কোরিয়ায় কুং হি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে পড়ছেন মাহমুদ শেখ। নিজেও পড়াচ্ছেন একটি স্কুলে। সিউলে শিক্ষকতা করছেন তাঁর মতো আরো অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। তিনি জানান, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য আদর্শ জায়গা এটি। তবে বেশির ভাগ বাংলাদেশি কোরীয় ভাষা না জানায় সমস্যায় পড়ে। ভাষা জানলে এ দেশে অনেক খণ্ডকালীন কাজ মেলে।
সুলেখারা ভালোই আছেন ভারতে
ভারতের চেন্নাইয়ের এশিয়ান কলেজ অব জার্নালিজমে পড়েন নারায়ণগঞ্জের মেয়ে সুলেখা রায়। এর আগে তিনি কলকাতার একটি কলেজে পড়াশোনা করেছেন। চেন্নাই থেকে তিনি জানান, ‘ভারতে পড়াশোনা করার আগে ভাবতে হবে, কোন বিষয়ে পড়তে চান। যদি কেউ মেডিক্যাল কিংবা প্রকৌশলে পড়তে চান, তাহলে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেন। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বিষয়েই খুব ভালো পড়ায়; খরচও কম। তবে সমস্যা একটাই, একানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতি নেই।’
সূত্র: কালের কন্ঠ । সিলেবাসে নেই । ২৯ মার্চ, ২০১১
 

  • শিক্ষাবিষয়ক দরকারি তথ্য তাৎক্ষণিক পেতে আমাদের ফেইসবুক পেজে লাইক দিয়ে রাখুন : www.facebook.com/EducationBarta
  • মন্তব্য করুন

    This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.