বইয়ের পাঠের সঙ্গে ছবি শিক্ষার্থীদের মনযোগী হতে সহায় হয়

পাঠ্য বইয়ে যতোই সহজ করে পাঠ বুঝিয়ে দেওয়া হোক, সঙ্গে ছবি জুড়ে না দিলে শিক্ষার্থীরা মনযোগী নাও হতে পারে। শিক্ষার্থীদের বিরক্তি কাটাতে ছবি বেশ কাজে দেয়। বইয়ের পাঠের সঙ্গে ছবি শিক্ষার্থীদের মনযোগী হতেও সহায় হয়।
শিশুদের মানসিক বৃদ্ধি রোধের জন্য সমাজে প্রচলিত যে বাঁধাগুলো বিরাজমান সেগুলো আমরা রোধের চেষ্টা করিনা বরং সহজেই মেনে নেই। যেমন শিশুদের প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাগ্রহনের চেয়ে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সাথে প্রচলিত ফল বৃদ্ধির জন্য প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেই। সেখানে তাদের ক্রিয়েটিভি থাকুক আর নাই থাকুক। আর তাই অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেই। এমন সব বই ক্রয় করি যেগুলো তাদের ক্রিয়েটিভিকে জাগ্রত করেনা, বরং কমায়। আমরা তাদেরকে এমন সব বিদ্যালয়ে পাঠাই যেগুলো শুধু পরীক্ষানির্ভর, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নির্ভর এবং ব্যয়বহুল । বইয়ের ভারে শিক্ষার্থীদের ন্যুজ করে ফেলি।ছবি ও ইলাসট্রেশনের বই যা তাদের কল্পনাশক্তিকে বৃদ্ধি করে সেগুলো পড়াই না , এগুলোর ওপর জোরও দিইনা। এ ধরনের পাঠ বা পুস্তকের দিকে তাদের আকৃষ্ট না করিয়ে কিভাবে পরীক্ষায় শুধু গ্রেড় পেতে পারে সেদিকেই নজর দিই। এ বিষয়টি আসলে নতুন নয় তবে এটিকে সম্প্রতি সম্মুখে নিয়ে এসেছে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি আর্টিকেল। আর্টিকেলটির শিরোনাম হচেছ ‘ Picture Books No Longer a Staple for Children’ অর্থাৎ ছবিসমৃদ্ধ বই বাচাচদের জন্য এখন আর প্রধান বা মূল বিষয় নয়। সেখানে বলা হয়েছে যে, ছবি সমৃদ্ধ বই , চমৎকার ইলাসট্রেশন, আকর্ষণীয় রং এবং স্পষ্ট ছাপার গুরুত্ব দিনে দিনে যেন কমে যাচ্ছে।

ছবিসমৃদ্ধ একটি বইয়ের চিত্রসমূহ শিশু শিক্ষার্থীদের বুঝতে সাহায্য করে যে তারা কি পড়ছে এবং তাদের চেয়ে বড় শিক্ষার্থীদের সাহায্য করে ছবির মাধ্যমে প্রকাশিত গল্প বা বিষয়টি বিশ্লেষন করতে। তারা যখন কোন বিষয় বা গল্প বুঝতে সমস্যার সম্মুখীন হয় , তখন ঐ বিষয়ের সাথে প্রদত্ত ছবি কথা বলে এবং শিক্ষার্থীরা তখন অনেক সহজেই সেখানকার মেসেজ বুঝতে পারে। ইলাসট্রেশন বিদেশী ভাষায় লিখিত কোন কিছু শিক্ষার্থীদের জন্য বুঝতে পারার একটি শক্তিশালী উপায় । এভাবে আমরা যেহেতু বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজি পড়ছি, তাই ইংরেজিতে লিখিত কোন বিষয় বুঝতে অনেক সহজ হয় যদি সেখানে ছবি থাকে। শিশুরা আর্ট/কলা পছন্দ করে।আর এজন্যই তারা দীর্ঘ সময় ধরে রং করা, ছবি আঁকা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ছবি সমৃদ্ধ বই ভাষার শব্দ অনুশীলন করতে সহায়তা করে। বাবা, মা-বা অভিভাবক হিসেবে এটি আমাদের দায়িত্ব যে, তাদেরকে প্রতিটি নতুন, বিষয়ের সাথে, আকর্ষণীয় বস্ত‘র সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। ছবির এক ধরনের রিদম বা সুর আছে, রাইম বা চরণ আছে এ গুলো শিশুদের শব্দ করে পড়তে সহায়তা করে। আর তখন তারা এবিষয়গুলো শিখে ফেলে, উচ্চারণ শিখে ফেলে। কোন ছবির বইয়ে কোন বিষয়ের পুনর্ব্যক্তি শিক্ষার্থীকে ছবির মাধ্যমে গল্প ও অর্থ প্রকাশে অংশগ্রহন করতে সহায়তা করে। বাচ্চাদের চেয়ে বেশি বয়সি শিক্ষার্থীরাও উত্তেজিত হয়ে ওঠে যখন তারা ছবির মাধ্যমে বুঝতে পারে সামনের কি হতে যাচেছ এবং তখন উচচারণ সংক্রান্ত সচেতনতা ফনিমিক অ্যাওয়ানেস, ফনিক্স কম্প্রিহেনশন এবং ফ্লুয়েন্সি বা দ্রুততার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে।
ছবি সমৃদ্ধ পুস্তক বহুবিধ সংবেদাত্মক (multi-sensory) যা শিশুদের মনকে বিকশিত করে এবং তাদের কল্পনায় নাড়া দেয়। তারা তখন শুধু কান দিয়ে গল্পটি শোনেনা, তারা তখন ইলাসট্রেশন দেখে, গন্ধ নিয়ে বুঝতে পারে, বইয়ের পাতা ছুয়েও বিষয় বুঝতে পারে। ছবির বই বা বইয়ের ছবি একটি সাহায্যকারী যন্ত্র বা টুল কারণ ও ফলের (কস অ্যান্ড ইফেক্ট) ধারণা শিখনের ক্ষেত্রে। বাচ্চাদের ছবির বই পড়ে শোনাানোর পূর্বে তাদের বলতে হবে যে, মূল শব্দগুলো অর্থাৎ কি ওয়ার্ডগুলো তাদের শোনাতে হবে। কারন এই শব্দগুলোই একটি গল্পে দেখা যায় কারন ও ফলের মধ্যো সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে। ছবির বই শিক্ষার্থীদের মধ্যে গল্প তৈরি করার অনুভুতি জাগায়। তারা গল্পের শুরু, মধ্যভাগ ও শেষভাগ জানতে পারে এবং বয়স উপযোগী বিষয়গুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে এবং এগুলোর মধ্যে দ্বান্দিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। ছবি পুরেপুরি ভিন্নভাবে , অধিকতর ইন্টারঅ্যাকটিভ কমিউনিকেশন গড়ে তুলতে পারে শিশু ও বাবা মায়ের মধ্যে। তাদের মধ্যে, ছবি, গল্প ও শব্দ ইত্যাদি নিয়ে কথা হতে পারে যার অর্থ হচেছ এক ধরনের ইন্টারঅ্যাকশন যা রিডিং কম্প্রিহেনশনকে অধিকতর উন্নত করে। ছবির বই ছবিতে আমরা কি দেখছি তা বলার সুযোগ দেয়, কি দেখেছি, কি ছিল পূর্বে , কি হতে পারে ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়েও কথা হতে পারে অর্থাৎ কল্পনাশক্তিকে নাড়া দেয়।
ছবির বই অদ্বিতীয় সাহিত্যিক কাঠামো উপস্থাপন করে যেখানে গল্প শিল্পের সাথে মিশে যায়। এখানে গল্প ও ছবির ইলাশট্রেশন এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, এ দুটো বিষয়ই গল্প বলতে সহায়তা করে। ছবির বই পড়া বা দেখা মানে শিল্প ও কলা আবিষ্কার করা।যদিও কোন বইয়ের কাভার দেখে বইটিকে বিচার করা যায়না তবে শিশুরা প্রথমেই বইয়ের কাভার দেখে বই পছন্দ করে। অতএব চমৎকার ইলাশট্রেশন দিয়ে শিশুদের আকর্ষণ করা উচিত যাতে তারা বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং বইয়ের প্রতি এই ভালবাসা তাদের চিরদিনের জন্য আটকে রাখে। এমনকি বই পড়তে পাড়ার আগ থেকেই শিশুরা বইয়ের ছবির সাথে কথা বলে, সাড়া দেয়। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে বইয়ে ইলাশট্রেশন আছে সেই বইগুলো অন্যগুলোর চেয়ে বেশি পড়ে। কারন এখানে মজা আছে এবং সহজেই বুঝা যায়। তা ছাড়া অনেক লম্বা সময় পড়ার মধ্যে ছবি দেখা এক ধরনের বিরতি, কাজেই এটি আকর্ষণীয় এবং আপিলিং। ছবি শিশুদের কল্পনার রাজ্য আবিষ্কার করতে সহায়তা এবং বইয়ের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাবলীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলাতে সহায়তা করে। আর শিশুদের এগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া মানে বইটির ঘটনাবলী তাদের কাছে বাস্তবে দেখানো।
সচিত্রবই পাঠকদের সামনে বিশেষ অর্থ প্রকাশ নিয়ে হাজির হয় এবং অনেক তথ্য বহন করে। কোন কৃষি খামারে যাওয়ার ছবি, কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার ছবি, চিড়িয়াখানার ছবি একটি শিশুকে দেখানো হলে এবং শিশুটি সেখানে না গিয়েও অনেক তথ্য পেতে পারে, স্থানটি সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা নিতে পারে এবং এই ধারণাগুলো ভবিষ্যত জীবনে বহু কাজে লাগে।তাদের নতুন ধারনা, নুতন কোনকিছু, মানূষ এবং ভিন্ন পরিবেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এগুলে তাদেরকে নুতন পরিবেশ ও বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করতে এবং জানতে সহায়তা করে এবং এভাবে জানাই তার প্রকৃত জানা, মুখস্ত’নির্ভর জানা নয়। কোন বিষয় সম্পর্কে তারা ব্যাকগ্রাইন্ড ধারনা লাভ করতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে যেটি হয় তা হলো কোন বিষয় সম্পর্কে ক্রিটিক্যালি কোন কিছু চিন্তা করতে সহায়তা করে।ছবি দেখে তারা অনুমান করতে পারে, ভবিষ্যত সম্পর্কে বলতে পারে।ছবি ব্যবহার করে তারা বাচাচাদের বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্নের সাথে পরিচয করিযে দিতে পারে, কোন বিষয়ের ক্লু দিতে পারে যা ছবি ছাড়া সম্ভব নয়।
ছবিসম্বলিতবই বয়স্ক ও শিশুদের মাঝে ইন্টার‌্যাকশনের এক চমৎকার সুযোগ করে দেয়।এটি জীবনব্যাপী বইয়ের প্রতি ভালবাসার আর একটি ক্রিটিক্যাল উপাদান।একটি শিশু কি পছন্দ কি অপছন্দ করে সচিত্র বই তাদের সামনে উপস্তি’ত করলে এবং বইয়ের প্লট সম্পর্কে তকে বলা হলে আমরা শিশুর অনেক সাইকোলজিক্যাল বিষয় সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। । ছবির বই শিক্ষার্থীদের ভিজ্যুয়াল থিংকিং স্কীল বাড়ায় । তারা ছবিতে যা দেখে তার সাথে বাস্তব জগতের অনেক কিছুর সাথে , কারণের সাথে ধারণার সাথে মেলাতে পারে।ছবির বই শিশুকে আর্ট বা শিল্পকে ভালবাসার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন যা একটি শিশুকে আর্ট গ্যালরিতে নিয়ে গেলেও অর্জন করতে পারেনা। বইয়ের ইলাশট্রেশন বা সচিত্র বই শুধুমাত্র এক ধরনের ডেকোরেশন নয়, এগুলো বরং গল্পের ঘটনাকে ও আবেগকে আরও শক্তিশালী করে। কিভাবে মনোযোগী শ্রোতা হতে হয় তা ছবির বই আমাদের শেখায়।
ক্যান্ডেলউইক প্রেসের কারেন লস বলেছেন , ছবি থেকে ছবির বই যখন একজন পাঠক দেখে এবং পড়ে তখন অজানা ও অদেখা বস্তু দিয়ে তার কল্পনার রাজ্য ভর্তি হয়ে যায় অর্থাৎ তাকে ক্রিয়েটিভ করে।ছবির বই শিশুদের মনে এমনভাবে নাড়া দেয় যা শুধু শব্দ করে বই পড়লে সম্ভব হয় না, একথা বলেছেন রিচার্ড জেনট্রি নামক একজন সাইকোলোজসিস্ট । শিশুদের পাশে যখন বড়রা থাকেনা কিছু বলে দেওয়ার জন্য, বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তখন ছবিই তাদের সাথে কথা বলে, ছবিই অনেক সময় তাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়। ছবিই শিক্ষার্থীদের মধ্যে লেখা দক্ষতার বীজ বপন করে । ছবির মাধ্যমে বই পড়া এক ধররেন মজা, এক ধরনের আনন্দ, এক ধরনের কৌতুক। আর আনন্দের মধ্য দিয়েই তো শিক্ষা অর্জন করতে হয় এবং করাতে হয়।
লেখক : মুহম্মদ মাছুম বিল্লাহ,
সাবেক অধ্যাপক, সিলেট, কুমিল্লা, মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ এবং রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ

  • শিক্ষাবিষয়ক দরকারি তথ্য তাৎক্ষণিক পেতে আমাদের ফেইসবুক পেজে লাইক দিয়ে রাখুন : www.facebook.com/EducationBarta
  • Leave A Reply

    Your email address will not be published.

    This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.