ইংরেজি ক্লাসে আমরা কতটা বাংলা বলব?

আমাদের অনেক ইংরেজি শিক্ষকদের মাঝে একটি ধারনা প্রচলিত যে, ইংরেজি টেক্সটি পড়ানোর সময় যত বেশি বাংলা ব্যবহার করে পড়ানো যায় শিক্ষার্থীরা তত ভালভাবে বিষয়টি বুঝে, পড়তে আগ্রহী হয় এবং এটি তাদের জন্য বেশ মঙ্গলজনক।তাই, অনেক শিক্ষক ইংরেজি একটি টেকস্ট পড়ানোর পর পর কিংবা সাথে সাথে বাংলা তো বলেনই , প্রতিটি শব্দের বাংলা বলেন। ২০১৬ সালের ৭-১১ আক্টোবর পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা অঞ্চলের কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ঘুরে , ক্লাস পর্যবেক্ষন করে ধারণাটি আরও পোক্ত হলো।
চুয়াডাঙ্গার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একজন ইংরেজি শিক্ষক অষ্টম শ্রেণিতে ইংরেজি পড়াচিছলেন।তার ক্লাসে বসে পড়লাম শিক্ষার্থীদের সাথে।দেখলাম ইংরেজি পড়াতে গিয়ে তিনি বাংলা তো বলছেনই, প্রতিটি শব্দের বাংলা বলে দিচেছন অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের আর করার তেমন কিছু নেই। করে করে যে শেখা সে বিষয়টি ওই ক্লাসে ছিলনা। এভাবে করতে করতে এক পর্যায়ে বললেন ’ এবার আমরা এক লাইন ইংরেজি পড়ব এবং এক লাইন বাংলা বলব’।এভাবেই তিনি পুরো ক্লাস নিলেন। তারপর শুধুমাত্র বইয়ের প্রশ্নোত্তর নিয়ে আলোচনা করলেন। তাও বাংলায়। নিজে কোন প্রশ্ন তৈরি করে শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলেন না। অনেক শিক্ষক অবশ্য এই কাজটি করেন । ঐএকজন যুবক এবং নতুন শিক্ষক। আশা ছিল তার কাছ থেকে অনেক নতুন ধরনের ইংরেজি টিচিং টেকনিক জানা যাবে বা দেখা যাবে কিন্তু তিনি করলেন পুরোটাই ট্রাডিশনালভাবে। অর্থাৎ তার শিক্ষকদের ক্লাস তিনি যেভাবে দেখে এসেছেন সেভাবেই হয়তো করিয়েছেন। তার কাছে হয়তো মনে হয়েছে ওভাবে ইংরেজি পড়ানোটা শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শিখতে সহায়ক হবে। কিন্তু ইংরেজি পড়ানোর জন্য বহু ধরনের টিপস, টেকনিক এবং পদ্ধতির কথা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে আলোচিত হচেছ, প্রকাশিত হচেছ । বুঝলাম এগুলোর সাথে ঐ শিক্ষক কিংবা তার মতো অনেকেরই পরিচিতি নেই।
আমরা ভুলে যাই যে, আমরা শিক্ষার্থীদের ইংরেজি পড়াচিছ তাদেরকে ভাষাটি শেখানোর জন্য। বইয়ে, পাঠে, টেকস্টে যে প্যাসেজটি বা গল্পটি আছে তা বাংলায় তাদের বুঝিয়ে দেয়ার জন্য নয়। ইংরেজি পাঠের মর্মোদ্ধার শিক্ষার্থীদেরকেই করতে হবে । তাদেরকে পাঠ থেকে শেখা বাক্য ব্যবহার করে ভাষা প্রাকটিস করতে হবে।শিক্ষকের কাজ হচেছ বিষয়টি ধরিয়ে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের টেকস্ট বার বার পড়তে হবে। টেকস্টে ব্যবহ্রত বিভিন্নভাবে গঠন করা বাক্যের গঠন প্রকৃতির সাথে তারা পরিচিত হবে, পড়ে পড়ে বাক্যের গঠন একসময় নিজেদের আয়ত্বে চলে আসবে। আয়ত্ব করে নিজের ব্যবহ্রত বাক্যে সেগুলো ব্যবহার করতে পারবে। মুখস্থ করে গঠন প্রণালী শিখলে হবেনা বা সেভাবে শেখার দরকার নেই।আমরা শিক্ষার্থীদের ওভাবে শেখাই কিন্তু শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে তা কাজে লাগাতে পারছেনা, এটিই বাস্তবতা। বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত, চারদিকে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী এবং বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা ভাষা ব্যবহার করে প্রাকটিস করবে। শিক্ষকের কাজ হলো সেই পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া , ফ্যাসিলেট করা, উৎসাহ প্রদান করা।
যে লেসনটি শিক্ষক পড়াচিছলেন সেটি হচেছ ডিফারেন্ট পিপল, ডিফারেন্ট অকুপেশন । এটি English For Today বইয়ের ইইনিট-৭, লেসন-২ : দ্যা আমা ডাইভার্স; টেক্সটটি দেওয়া হলো-
In some fishing villages along the coast of Japan, there are amazing groups of women known as ‘ Ama divers’. These women worked and are still working as Ama. The word ‘ Ama’ means ‘ women of the sea or sea women.’ They are independent divers. They make their living by diving. They can dive to the depth of the sea up to 25 meters. And they dive without using oxygen tanks or other breathing equipment.
The Ama divers rely on their own skills and breathing techniques. They use that skill and technique to push themselves down to the bottom of the sea and back to the surface again. They can hold their breath for up to two minutes. Careful watching, lung capacity and hunter instincts are the special qualities of Ama divers.
However, some of these young villagers are going to the city for other jobs. The remaining Ama divers are now aged between 50 and 60. But there are still some who continue to dive even at their 70s. if the young people do not take Ama diving , soon this profession will die out.
তিনি যা করছিলেন তা হলো – ডাইভিং অর্থ কি, লিভিং অর্থ কি, হোল্ড অর্থ কি ইত্যাদি। কিন্তু শিক্ষার্থীদেরকে যে ভাষা ও বাক্য প্রাকটিস করাতে হবে সেদিকে তিনি একটুও খেয়াল করলেন না। একটি বাক্যও তিনি কোনভাবে প্রাকটিস করালেন না। এটি আসলে ইংরেজি ভাষা শেখানোর জন্য খুব ফলপ্রসূ ক্লাস নয়।
They make their living by diving বাক্যটির বাংলা, প্রতিটি শব্দের বাংলা তিনি বার বার জোর দিয়ে বলছিলেন কিন্তু একবারও শিক্ষার্থীদের এই ধরনের কোন বাক্য তৈরির কথা বলছেন না। ঐ শিক্ষকের ক্লাস নেয়া শেষ হলে আমি শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলাম ’ জাপানের আমা’ সম্প্রদায়ের লোক পানিতে ডুবে মুক্তা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ ধরনের আর কি কি পেশার কথা তোমার মনে আসে যেগুলো ডাইভিংএর জায়গায় বসিয়ে একই ধরনের বাক্য তোমরা নিজেরা তৈরি করতে পার । বিষয়টি কিন্তু আমি তাদেরকে ইংরেজিতেই বললাম। দেখলাম শিক্ষার্থীরা ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই বিভিন্নজন বিভিন্ন ধররেন পেশা দিয়ে বাক্য তৈরি করেছে। সবারগুলো মিলিয়ে দেখা গেল তারা ১৫টি বাক্য তৈরি করেছে যেগুলো বোর্ডে লিখে দেয়ার পর সবাইকে লিখতে এবং পড়তে বললাম, সবাই তাই করল। এখন সবারই ১৫টি বাক্য শেখা হলো। এই গঠনপ্রণালীটিও তাদের জানা হলো। তারা যে বাক্যগুলো তৈরি করেছে সেগুলো দেওয়া হলো-
They make their living by teaching.
They make their living by farming
They make their living by working in the shop
They make their living by playing football.
They make their living by dancing on the stage
They make their living by planting trees
They make their living by selling tea
They make their living by pulling rickshaws
They make their living by driving cars.
আমি শুধুমাত্র in the shop এবং on the stage অংশটুকু যোগ করে দিয়েছিলাম। দেখা যাচেছ ইংরেজি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের বুঝার মতো ইংরেজি বলতে পারলে তারা বুঝে এবং ফলপ্রসূভাবেই সাড়া দেয়। অনেক শিক্ষক বলে থাকেন ’ ইংরেজি ক্লাসে ইংরেজি বললে শিক্ষার্থীরা বুঝেনা। তাই আমরা বাংলা ব্যবহার করি।’ সব সময় বাংলা ব্যবহার না করে ধীরে ধীরে ইংরেজি ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীরা সেগুলো শিখবে এবং শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন ঘটবে।
আর একটি বিষয় আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। সেটি হচেছ একটি ভাষা ন্যাচারালি শেখার জন্য সে ধরনের একটি পরিবেশে থাকতে হয়। যেমন আমাদের দেশের একটি বাচাচকে যদি ইংলিশ স্পিকিং কোন দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কয়েকমাস পরে দেখা যাবে বাচচাটি অনর্গল ইংরেজি বলছে যদি সে ¯‹েুল নাও যায়। একই ঘটনা ঘটবে যদি তাকে কোন উর্দু কিংবা আরবী ভাষাভাষী দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, সে ঐ ভাষায় কথা বলা শিখে যাবে। এর কারন কি? ভাষা শেখার জন্য যে পরিবেশ দরকার ছিল তা সে পেয়েছে বলেই ভাষাটি আয়ত্ব করে ফেলেছে। সে কিন্তু কোন গ্রামার শিখেনি, কোন টিচারের কাছে যায়নি কিংবা কোন বইও হয়তো পড়েনি। আমাদের শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে এবং পরিবেশগত ভাবে সে ধরনের পরিবেশ পাওয়ার কথা নয় অর্থাৎ চারদিকে, বাসায়, রাস্তায় এবং দোকানে সর্বত্রই তাকে বাংলা শুনতে হচেছ। এটিই তো আমাদের দেশের জন্য স্বাভাবিক। অথচ তাদের ইংরেজি শিখতে হবে এবং হচেছ। কিভাবে তা সম্ভব হবে যদি ইংরেজি ক্লাসের শিক্ষকগনও ক্লাসে ইংরেজি ব্যবহার না করেন? অন্যান্য ক্লাস বাংলায় হয়, বাড়ীতে বাংলায় কথা বলা হয়, হাটে-ঘাটে রাস্তায় সর্বত্রই তো বাংলা। কাজেই ইংরেজি ক্লাসে ৪০ মিনিট যাতে শিক্ষার্থীরা ইংরেজির পরিবেশ পায় সেজন্য শিক্ষকদের কায়দা করে ইংরেজি বলতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা একদিকে বুঝে অন্যদিকে আনন্দ পায়। আর এটি এমনিতে সম্ভব নয়, অনেক চিন্তা ভাবনা, প্রচেষ্টা, ব্যক্তিগত আগ্রহ ও গবেষণা দরকার। কিভাবে বললে, কি করলে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শুনে মজা পাবে এবং তারাও বলার চেষ্টা করবে সে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকদের ভাবতে হবে।
ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ক্লাস ব্যতীত অন্যসব ক্লাসে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ব্যবহার করে, কথা বলে। এটি একটি চমৎকার পদ্ধতি, চমৎকার সিস্টেম। আর এ জন্যই শিক্ষার্থীরা ভাল ইংরেজি বলতে পারে, লিখতে পারে, বিদেশী সিনেমা সহজে বুঝতে পারে যা এ্ই যুগে দরকার। ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি বলার অভ্যাসকে ইদানিং অনেকে সমালোচনা করতে শুরু করেছেন। একটি টিভি চ্যানেলে দেখলাম খুব উষ্ণা প্রকাশ করছেন উপস্থাপিকা এবং দু’একজন অধ্যক্ষের সাক্ষাতকারও দেখিয়েছেন কেন শিক্ষার্থীদের বাংলা ক্লাস ছাড়া অন্য ক্লাসে বাংলা বলতে দেয়া হয়না। অধ্যক্ষগন চমৎকারভাবেই বলেছেন ’ আমরা চাই শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের ইংরেজি বলবে কিন্তু তাদের ইংরেজি বলার সুযোগ তো কম। বাসা, স্টেশন সর্বত্রই বাংলা বলা ও শোনা হয়। কাজেই আমরা গুরুত্ব সহকারে তাদেরকে বিদ্যালয়ে থাকাকালীন ইংরেজি বলার নিয়ম করেছি।’ সঠিকমানের ইংরেজি শিখতে হলে আসলে এভাবেই করা প্রয়োজন। বাংলা মাধ্যমে তো এটি সম্ভব নয়। তাই অন্তত ইংরেজি ক্লাসগুলো যাতে ইংরেজিতে নেয়া যায় সেজন্য বিদ্যালয় এবং শিক্ষকদের আগ্রহী ও যতœবান হতে হবে। এতে শিক্ষকদের নিজেদেরও পেশাগত উন্নয়ন ঘটবে। একটি ভুল ধারনা আমরা অনেকেই পোষন করি যে ইংরেজি শিখলে বোধ হয় বাংলাকে অবজ্ঞা করা হয়, ইংরেজি শিখলে বোধ হয় বাংলা শেখা বা শেখানোর প্রতি শিথিলতা আসে, ব্যাপারটি আসলে তা নয়। যারা ইংরেজি ভাল জানেন তাদের অনেকেই ভাল বাংলা জানেন এবং লিখতে পারেন কিন্তু অনেকে ভাল বাংলা জানেন কিন্তু ভাল ইংরেজি জানেন এমন লোকের সংখ্যা কম। আমাদের বাংলা ও ইংরেজি দুটোই ভালভাবে শিখতে হবে এবং শিক্ষার্থীদেরকেও শেখাতে হবে।
লেখক : মাছুম বিল্লাহ, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে শিক্ষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত এবং সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজের শিক্ষক।

  • শিক্ষাবিষয়ক দরকারি তথ্য তাৎক্ষণিক পেতে আমাদের ফেইসবুক পেজে লাইক দিয়ে রাখুন : www.facebook.com/EducationBarta
  • মন্তব্য করুন

    This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.