প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী : পরীক্ষায় ভয় কী!

২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় সারা দেশে প্রথম হয়েছিল নরসিংদীর মনোহরদী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাদিয়া শিকদার । এবার যারা পরীক্ষায় অংশগ্রহন করবে, সেসব শিক্ষার্থীদের জন্য সাদিয়ার পরামর্শ−
সময় যেহেতু বেশি নেই, তাই নতুন করে কোনো প্রশ্নোত্তর না পড়াই ভালো। আগে যা পড়েছ, এ সময়টায় তা-ই বারবার পড়বে। কোনো কিছু বুঝতে সমস্যা হলে আলাদা কাগজে লিখে রাখবে। যত দ্রুত সম্ভব, তা শিক্ষক বা অভিভাবকের কাছ থেকে জেনে নেবে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি, বই পড়ে আমিই প্রশ্নোত্তর তৈরি করতাম। আমার সহপাঠীদের অনেককেই দেখতাম, অনুশীলনীর প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করত। প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করলে হয়তো নম্বর পাওয়া যায়, কিন্তু অনেক কিছুই অজানা থেকে যায়। এতে খুব বেশি নম্বরও আশা করা যায় না। তাই পড়া পড়ে নিজে উত্তর করার চেষ্টা করবে। যদি এটা করো, তাহলে কোনো প্রশ্নোত্তর ফেলে আসতে হবে না। নম্বরও উঠবে বেশি।
শেষ সময়ে যা করবে
কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে প্রথমত মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। তারপর শিক্ষার্থীকে নিজেই নিজের দুর্বলতা শনাক্ত করতে হবে। দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে কী করণীয় তাও ঠিক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকের সহযোগিতা নেবে। শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে, কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে যেন তার সমাধান জানা যায়। বাসায়ই মডেল টেস্ট বা পরীক্ষা দিতে পারো। পরে সেটা মা-বাবা বা স্কুলের শিক্ষকদের দেখাবে। এতে ভুল ধরা পড়বে এবং তা সংশোধনের সুযোগ পাবে। যেসব প্রশ্নের উত্তর ভুল হয়েছে তা পুনরায় লিখবে। দেখবে আবারও ভুল হচ্ছে কি না।
যারা ভালো করতে চাও, শিক্ষক বা স্কুল থেকে সরবরাহ করা হ্যান্ডনোটের পাশাপাশি নিজেও প্রশ্ন এবং উত্তর তৈরি করার চেষ্টা করবে। উত্তরের মানের দিকে খেয়াল করবে। উত্তর অন্যদের চেয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করবে। তবে উত্তর ব্যতিক্রমভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে অনেকেই অপ্রাসঙ্গিক কথা লেখে−এটা মোটেও উচিত নয়।
প্রশ্ন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে
উত্তরপত্র হাতে পাওয়ার পর তা অন্তত একবার ভালো করে পড়ে নেবে। যে প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে ভালো পারো, সেটি দিয়ে উত্তর লিখতে শুরু করবে। সব প্রশ্ন কমন না পড়লেও উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে। প্রশ্নের উত্তর ভুলে গেলে মনে করার চেষ্টা করবে।
সুন্দর ও পরিপাটিভাবে খাতায় উপস্থাপন করবে। বাসায় যেভাবে পড়েছ বা যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছ, ঠিক সেভাবেই খাতায় লেখার চেষ্টা করবে। প্রশ্নে যা চাওয়া হয়েছে, ঠিক তা-ই লিখবে। অতিরিক্ত লেখার দরকার নেই।
সময়টাকে ভাগ করে নাও
দুই সপ্তাহ সময় পাচ্ছো। এ সময়টা প্রতিটি বিষয় অন্তত একবার রিভিশন দিতে হবে। একটি রুটিন করে নাও। প্রতিদিন একটি বিষয় শেষ করার চেষ্টা করো। তা না পারলে অবশ্যই একটা বিষয় রিভিশন দিতে দুদিন সময় নাও। এভাবে সময় ভাগ করে নিলে পরীক্ষার আগেই ছয়টি বিষয় এক থেকে দুবার শেষ করা যাবে। তবে এটা তখনই করা সম্ভব যখন দৈনিক অন্তত ছয় থেকে আট ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে। যদি এমনটি করতে পারো, তাহলে পরীক্ষায় নিশ্চয়ই ভালো ফল করতে পারবে।
প্রতিটি বিষয়ে সমান গুরুত্ব
ভালো ফল পেতে সব বিষয়েই সমান জোর দিতে হবে। প্রতিটি বিষয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের গুরুত্বও সমান। দুর্বলতা আছে এমন প্রশ্ন বা অধ্যায় আলাদা করে নিতে পারো। পরিকল্পনা করে সে বিষয়গুলো আয়ত্ত করো। দেখবে অনেক সহজ হয়ে গেছে। অনেক ছাত্রছাত্রী ধর্ম শিক্ষাকে সহজ ভেবে তেমন গুরুত্ব দেয় না। আবারও বলছি, ভালো ফল পেতে চাইলে কোনো বিষয়কেই অবহেলা করা যাবে না।
রিডিং বেশি বেশি
সবচেয়ে বড় কথা, সব বিষয়েই বারবার পড়তে হবে। তাহলে সেটা বেশি মনে থাকবে। অনেকে না বুঝেই নোট বা গাইড বই থেকে প্রশ্ন মুখস্থ করে। এটা উচিত নয়। রিডিং পড়ে উত্তর লেখার ক্ষমতা থাকলেই অন্য সব পরীক্ষার্থীর চেয়ে ভিন্নতর উত্তর লেখা যাবে। আর ‘সত্য-মিথ্যা’, ‘সঠিক উত্তর’ ও ‘শূন্যস্থান পূরণ’ অনুশীলনীর প্রশ্নের বাইরেও আসতে পারে। পুরো বই পড়লে কিন্তু সহজেই এসব প্রশ্নের উত্তর করা যাবে।
উত্তর বড় হলেই ভালো হয় না
অনেকেই বড় বা রচনামূলক প্রশ্নের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, কিন্তু সংক্ষিপ্ত প্রশ্নে তেমন গুরুত্ব দেয় না। এটা মোটেও ঠিক নয়। সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর অল্প সময়েই শেষ করা সম্ভব হয় এবং সঠিকভাবে লিখতে পারলে তুলনামূলক বেশি নম্বর তোলা যায়। অনেকেই বাংলা, সমাজ, বিজ্ঞান, ধর্ম বিষয়ের রচনামূলক প্রশ্নের উত্তর অনেক বড় করে ফেলে। পরে খুব কম সময়ে তাড়াহুড়ো করে সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তর করে। এমন করলে সে বিষয়ে বেশি নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা তো নেই-ই, বরং নম্বর কমে যাবে।
কোনো প্রশ্নের উত্তর বড় করে লিখলেই যে ভালো নম্বর পাওয়া যাবে, এমনটিও কিন্তু নয়। প্রশ্নের উত্তর সঠিক ও প্রাসঙ্গিক হতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে যেন ভুল কিছু লেখা না হয়। ভুল হলে নম্বর কাটা যাবে।
আরো যা জানতে হবে
বিজ্ঞান বিষয়ে চিত্র আঁকার ব্যাপারে প্রশ্নে বলা না হলেও প্রশ্নের মান বা নম্বর বিবেচনা করে চিত্র দেওয়ার চেষ্টা করবে। এটি অতিরিক্ত নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। যারা নিয়মিত বাসায় পরীক্ষা দেয়, তাদের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় কাটাছেঁড়া তেমন হয় না। তাই বেশি বেশি লেখার চর্চা করতে হবে।
অনেক ছাত্রছাত্রী ইংরেজি ও গণিতে বেশি নম্বর তুলতে পারে না। ইংরেজির ক্ষেত্রে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও নতুন নতুন শব্দ শিখতে হবে। বইয়ের ‘প্যাসেজ’ ভালোভাবে বুঝে পড়তে হবে, যাতে প্রশ্নপত্রের প্রথম তিনটি প্রশ্নের উত্তর সহজেই দেওয়া যায়। আর গণিতের ক্ষেত্রে অনুশীলনীর সমস্যাগুলো বুঝে সমাধান করতে হবে। অনেক সময় পরীক্ষায় ছোটখাটো অনেক কিছুই মনে থাকে না। ফলে অঙ্কে যেমন ভুল হতে পারে, উত্তর করতে বেশি সময়ও লাগতে পারে। তাই সূত্র মনে রাখার পাশাপাশি অঙ্ক চর্চা করতে হবে।
অনুলিখন: হাবিবুর রহমান তারেক
সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ ।। সিলেবাসে নেই ।। ৯ নভেম্বর, ২০১০
 

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

gtag('config', 'UA-69122190-1');