স্কুল পাঠাগার কি হারিয়ে যাচ্ছে?

ভর্তির সময় পাঠাগার ব্যয় বাবদ অনেক স্কুল ‘ফি’ রাখলেও এর অধিকাংশেরই পাঠাগার নেই। কোনো কোনো স্কুলে থাকলেও তা প্রায় সারা বছরই বন্ধ থাকে। পাঠাগারের সঙ্গে ছাত্রদের সখ্য তৈরির কোনো উদ্যোগ নেই স্কুল কর্তৃপক্ষের। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আদিত্য আরাফাতহাবিবুর রহমান তারেক

স্কুলে পাঠাগার নেই। এত দিন এমনটিই জেনে এসেছে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল হাই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র ফরহাদ হোসেন। দশম শ্রেণীর ছাত্র শাহিদ ও রাশেদও জানে না, তাদের বিদ্যালয়ে পাঠাগার আছে। ‘ভবনের পঞ্চম তলায় বিদ্যালয়ের পাঠাগার। ছাত্ররা সাধারণত এত ওপরে ওঠে না, তাই হয়তো জানে না।’ এমনটিই জানালেন বিদ্যালয়টির সহকারী প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান হাওলাদার। পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা গেল, তালা ঝুলছে লাইব্রেরিতে। শুধু যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল হাই স্কুল নয়, পাঠাগার থাকার পরও দেশের বেশির ভাগ স্কুল-কলেজেই তা ব্যবহার করার সুযোগ পায় না শিক্ষার্থীরা। পাঠাগার নেই, এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এর চেয়েও বেশি।

কেন স্কুল পাঠাগার?
জনপ্রিয় লেখক ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পাঠাগারের বিকল্প নেই। এমনিতেই আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবে পাঠাভ্যাস কমে যাচ্ছে। পাঠাগারের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক না থাকলে মেধাবী জাতি আশা করা যায় না। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পাঠাগারের জন্য আলাদা কক্ষ থাকা দরকার। আর শুধু পাঠাগার থাকলেই হবে না; পাঠাগারে শিশু-কিশোরদের উপযোগী বই থাকতে হবে, পড়ার পরিবেশ থাকতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করা যায় না। এর জন্য পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, ছড়া-কবিতা, সায়েন্স ফিকশন, প্রবন্ধসহ বিভিন্ন বই পড়তে হবে। এসব বই পড়ার জন্যই সাধারণত স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পাঠাগারে যায়। এসব বই লাইব্রেরিতে রাখতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পাঠাগারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং পাঠের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।’

পাঠাগার নেই
প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে দনিয়ার একে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু বিদ্যালয়টিতে নেই কোনো পাঠাগার। বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র আশিকুজ্জামান জানায়, পাঠাগারের জন্য তারা অনেক আগে থেকেই কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে; কিন্তু বিদ্যালয়ে আজ পর্যন্ত পাঠাগার স্থাপন করা হয়নি। বিদ্যালয়টির অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র মারুফের বাবা এনায়েত হোসেন বলেন, ‘এ বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই নিম্নবিত্ত ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের। অনেক পরিবারের পক্ষে পাঠ্যবই কেনার সামর্থ্য নেই, সৃজনশীল বই কিনে পড়বে কিভাবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়টির একাধিক শাখা রয়েছে। কর্তৃপক্ষ কোনো শাখায়ই পাঠাগারের জন্য একটি কক্ষ বরাদ্দ করেনি। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সদ্যনির্বাচিত মহাসচিব মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘পাঠাগার না থাকলেও ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে না। তা ছাড়া ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেও আমরা এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাইনি।’ তিনি জানান, এ স্কুলের যে নতুন ভবনের কাজ চলছে সেখানে পাঠাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

লাইব্রেরি আছে; লাইব্রেরিয়ান নেই
রাজধানীর অন্যতম বিদ্যাপীঠ ধানমণ্ডি গভ. বয়েজ হাইস্কুলের পাঠাগারে পাঁচ হাজারের বেশি বই থাকলেও নেই কোনো লাইব্রেরিয়ান। ফলে অধিকাংশ সময় তা বন্ধ থাকে। দশম শ্রেণীর ছাত্র মো. মুশফিক বলেন, ‘লাইব্রেরি থাকলেই কি! বই পড়া তো দূরে থাক, লাইব্রেরিতে ঢোকারও সুযোগ পাই না।’ এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌর চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘চাইলেই তো আমরা সবকিছু করতে পারি না। লাইব্রেরিয়ানসহ আরো কিছু দাবি জানিয়ে সরকারের কাছে কিছুদিন আগে আবেদন করা হয়েছে।’ শুধু ধানমণ্ডি গভ. হাইস্কুল নয়, সারা দেশের অনেক বিদ্যালয়েই পাঠাগার থাকলেও লাইব্রেরিয়ান নেই।
সিলেটের সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, দি এইডেড হাই স্কুল, হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয়, রাজা জিসি হাই স্কুলের মতো ঐতিহ্যবাহী স্কুলগুলোতে গ্রন্থাগারিক পদে কোনো লোক নেই। সরকারও বই পড়ার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গ্রন্থাগারিক বলেন, ‘১৯৯৫ সালের জনবল কাঠামো অনুসারে স্কুল থেকে লাইব্রেরিয়ান পদটি তুলে নেওয়ার ফলেই আজ পাঠাগার চর্চা এ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।’
ময়মনসিংহ শহরের শতবর্ষী মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের পাঠাগারের বুক শেলফে কয়েকটি পুরনো বই পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন বইও কেনা হয় না।

নেই সৃজনশীল বই ও পত্রিকা
ঢাকার দনিয়া বর্ণমালা আদর্শ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র মাহমুদ হাসান বলেন, ‘ক্লাস সিক্স-সেভেন থেকে এখানে যেসব বই দেখছি এখনো পাঠাগারে সেই বইগুলোই, গল্প-কবিতার বই পাঠাগারে নেই।’
মতিঝিল মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্র জোবায়ের হাসান জানান, পাঠাগারে তাদের চাহিদা মোতাবেক ও সমসাময়িক বিশ্বের তথ্যসমৃদ্ধ বই নেই বললেই চলে। এ ছাড়া দৈনিক পত্রিকা পড়ার সুযোগও নেই। পাঠাগারে যথেষ্ট সংখ্যক বই আছে দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তালেবুর রহমান বলেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী আরো বই কেনার পরিকল্পনা আছে।’

ধুলো জমে আছে বুক শেলফে
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রসময় মেমোরিয়াল স্কুলের পাঠাগারে তিনটি আলমারিতেই ধুলোর আস্তর জমে আছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক অঞ্জলী প্রভা চৌধুরী বললেন, ‘স্কুলে একজন লাইব্রেরিয়ান না থাকলে শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরিমুখী হতে উদ্বুদ্ধ করবে কে? লাইব্রেরিয়ান নেই, তাই পাঠাগারের এ অবস্থা।’ সিলেটের শীর্ষস্থানীয় স্কুলগুলো ঘুরে দেখা গেছে প্রায় একই চিত্র। এ চিত্র দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ের। গভ. বয়েজ হাই স্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফরহাদ বলেন, ‘পড়ার সুযোগ পাব কিভাবে? লাইব্রেরি তো খোলাই হয় না।’

নেই আলাদা কক্ষ
মফস্বলের অনেক বিদ্যালয়ে পাঠাগার বলতে বোঝায় শিক্ষকদের রুমের আলমারিই! নরসিংদীর মনোহরদীর হাতিরদিয়া ছাদত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষই ব্যবহার করা হচ্ছে পাঠাগার হিসেবে। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র হৃতি্বক দাস ও রায়হান আহম্মেদ জানায়, বই পড়ার আগ্রহ থাকলেও প্রধান শিক্ষকের কক্ষে পাঠাগার থাকায় সংকোচের কারণে তারা কখনো বই নেয়নি। বিদ্যালয়টিতে একটি বিশাল দোতলা ও দুটি একতলা ভবন থাকা সত্ত্বেও পাঠাগারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কক্ষ নেই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি একটি নির্দিষ্ট কক্ষে পাঠাগারটি স্থানান্তরের জন্য।’
শুধু ছাদত আলী উচ্চ বিদ্যালয় নয়, নরসিংদী আইডিয়াল হাই স্কুল ও মনোহরদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে প্রায় একই চিত্র।

হারিয়ে যাচ্ছে পাঠাগার চর্চা
একসময় স্কুলগুলোর রুটিনে ‘লাইব্রেরি পিরিয়ড’ থাকলেও এখন নেই। এ ছাড়া পাঠাগার বন্ধ থাকা, বই না থাকা কিংবা পড়ার পরিবেশ না থাকায় এর প্রভাব পড়ছে পাঠাভ্যাসে। ফলে সৃজনশীল বইয়ের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের দূরত্ব বাড়ছে, হারিয়ে যাচ্ছে পাঠাগার চর্চা। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঠিক বিকাশ ঘটবে না−এমনটিই মনে করছেন অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক।

সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ ।। সিলেবাসে নেই ।। তারিখ: ১৮ মে, ২০১০

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

gtag('config', 'UA-69122190-1');